ঈদের পর ট্রেনের চাকা ঘুরতে পারে খুলনা-মোংলা রেললাইনে

ফানাম নিউজ
  ১২ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৫

২০২৩ সালের ১ নভেম্বর উদ্বোধন হয় খুলনা-মোংলা রেললাইন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এটি উদ্বোধন করেন। সেই শুরু, সেই শেষ। এরপর উদ্বোধন হয়েছে দেশের আরও কয়েকটি রেললাইন। সেসব রেললাইনে ট্রেনও চলাচল করছে। কিন্তু খুলনা-মোংলা রেললাইনে ট্রেনের চাকা আর ঘোরেনি। উদ্বোধনের পর বেশকিছু কাজ বাকি থেকে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ট্রেন চলাচলের জন্য বারবার মাস আর তারিখ উল্লেখ করলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদ উল ফিতরের পরপরই খুলনা-মোংলা রেললাইনে ট্রেন চলাচলের জন্য সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৩০ অক্টোবর খুলনার ফুলতলা থেকে মোংলা পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল করে। এরপর ওই বছরের ১ নভেম্বর প্রায় ৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খুলনা-মোংলা রেললাইনটি উদ্বোধনের পরও প্রকল্পের টেলিকমিউনিকেশন ও সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপনের কাজও বাকি থেকে যায়। কিন্তু সেই কাজও শেষ। মার্চ মাসে রেললাইনে ট্রেনের চাকা ঘোরার কথা বলেছিলেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মার্চ মাস পেরিয়ে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহও অতিবাহিত হয়েছে। হয়নি কিছুই।

এদিকে যথা সময়ে ট্রেন চলাচল শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনার একাধিক নাগরিক নেতা ও ব্যবসায়ী। তারা বলছেন, এই লাইনটি চালু হলে মোংলা বন্দর আরও বেশি সচল হবে এবং পণ্য আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। সেইসঙ্গে খুলনার মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এই রেলপথে ৮টি স্টেশন নির্মাণ করা হলেও সবগুলোতে এখনও আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। রেল স্টেশন ও রেল ক্রসিংগুলোতে নিযুক্ত করা হয়নি কোনো জনবল। এছাড়া মোট কতটি ট্রেন চলবে তা সহ ট্রেনের সময়সূচি ও ভাড়াও নির্ধারণ হয়নি। তবে চলতি বছরের শুরুতে রেলওয়ের এক ঘোষণায় বলা হয় এই রূটে তিন জোড়া ট্রেন চলাচল করবে প্রতিদিন।

খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম জানান, উদ্বোধনের সময় কিছু ফিনিশিং কাজ বাকি ছিল। সেগুলো এরইমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে এখনও জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। এই রুটে পণ্য পরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, সেই সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেনও চলবে।

খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান বলেন, খুলনা-মোংলা রেললাইন এখন যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত। ঈদের পরে ট্রেন চলাচল শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই রেললাইনের মাধ্যমে ট্রানজিট সুবিধার আওতায় মোংলা বন্দর থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহন সাশ্রয় ও সহজ হবে।

এই রেলপথে রূপসা নদীর ওপর ৫ দশমিক ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল সেতুও নির্মাণ করা হয়েছে। ৯টি স্থানে ভেইকেল আন্ডারপাস-ভিইউপি (রেল লাইনের নিচ দিয়ে যাওয়ার রাস্তা) নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ভিইউপির কারণে ট্রেন চলাচলের সময় রেল ক্রসিংগুলোতে যানবাহন আটকা পড়বে না। এছাড়া দুর্ঘটনারও ঝুঁকি থাকবে না। এই রেলপথে স্টেশন রয়েছে ৮টি বলেও জানান তিনি।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা সেতুর পর রেল সংযোগ মোংলা বন্দরের জন্য একটা আশীর্বাদ। এখন নদী ও সড়কপথে পণ্য বন্দরে আনা-নেওয়া করা যায়। তবে রেলের মাধ্যমে কন্টেইনার পরিবহন সবচেয়ে সাশ্রয়ী একটা মাধ্যম। মোংলার সঙ্গে ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের কন্টেইনার পরিবহন সহজ হবে। কমলাপুর আইসিডি ও ঢাকা থেকে আমদানি-রপ্তানি পণ্য কন্টেইনারে মোংলা বন্দরে আনা-নেওয়া সহজ হবে। মোংলা বন্দরে জাহাজের আগমন বৃদ্ধি পাবে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশারফ উজ জামান এবং খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মফিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, খুলনা-মোংলা রেল প্রকল্প উদ্বোধন হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম দ্রুত রেললাইনটি চালু হবে। এটা চালু হলে এই অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটবে।

২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোংলা-খুলনা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথম দফায় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০১ টাকা। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি।

তবে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর সর্বশেষ ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়। সেই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এরমধ্যে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রো রূপসা নদীর ওপর রেলসেতুর নির্মাণকাজ করেছে। বাকি কাজ করেছে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইরকন ইন্টারন্যাশনাল। প্রকল্পটির কাজ তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে রূপসা নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণ, মূল রেললাইন স্থাপন এবং টেলিকমিউনিকেশন ও সিগন্যালিং স্থাপন।