দুদকে সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির শত শত অভিযোগ

ফানাম নিউজ
  ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩৯

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই শত শত দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এসব লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে হারে অভিযোগ আসছে, তাতে মনে হচ্ছে অভিযোগের রেকর্ড হবে। অধিকাংশ অভিযোগে অভিযোগকারী নাম প্রকাশ করেননি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, দুদক অন্যান্য অভিযোগ যেভাবে যাচাই করে, এসব অভিযোগও একইভাবে যাচাই করা হবে। এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের। গ্রামীণ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ড. ইউনূস কীভাবে নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ করছেন, তার বিবরণ তুলে ধরেছেন। এই অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়কর ফাঁকি এবং অর্থ আত্মসাতের জন্য ড. ইউনূস তাঁর নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন।

এই ট্রাস্টের একমাত্র কাজ হলো ড. ইউনূসের পরিবারের দেখাশোনা করা। এভাবে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন বলেও একাধিক অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন এবং অন্যান্য দুর্নীতি।

একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে যে আসিফ নজরুল জামিন বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি শিল্প গ্রুপের সিইও জালিয়াতির মাধ্যমে ভাই ও বোনের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন। ছোট বোন তার বিরুদ্ধে মামলা করেন, পিবিআই মামলা তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণ পায়। আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকা নিয়ে ভিআইপি আসামিকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন। গান বাংলা টেলিভিশনের তাপসের জামিন আসিফ নজরুল বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে করিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত তথ্যও অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এভাবে আসিফ নজরুল ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে বহু জামিন করিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়াও আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে আসিফ নজরুল ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নিতেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সাব রেজিস্ট্রার পদায়নে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আসিফ নজরুল উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান, সাভারের মতো লাভজনক এলাকার সাব রেজিস্ট্রার বদলি করেন। এসব বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ অন্যতম। এ ছাড়াও রিজওয়ানার বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি জোর করে দখল করার অভিযোগও করা হয়েছে। একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। রিজওয়ানার স্বামী, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন কি না তা তদন্ত করার জন্য দুদককে অনুরোধ করেছেন একজন।

তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ অভিযোগই ভুক্তভোগীরা নাম-ঠিকানাসহ করেছেন। ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণও দেওয়া হয়েছে। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেছেন একজন। এভাবে প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকের সূত্রগুলো বলেছে, এসব অভিযোগ তারা যাচাই-বাছাই করছে। যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, যদি তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায় এবং সেগুলো আমলযোগ্য হয়, তা তদন্ত করা উচিত। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আগেও কোনো কোনো উপদেষ্টার দপ্তরের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় কিন্তু দুদকের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এখন যেহেতু তারা সরকারে নেই, দুদক তদন্ত করে দেখতে পারে। আগেও আমরা দেখেছি, যারা সরকারে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে দুদক কোনো পদক্ষেপ নেয় না। এখনো তেমন ধারাবাহিকতা রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়