
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো পাঠ্যক্রম বা অবকাঠামো নয়—সংকটটি লুকিয়ে আছে শ্রেণিকক্ষের বাইরের কাজে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) সাম্প্রতিক গবেষণা সেই বাস্তবতাকেই নগ্নভাবে সামনে এনেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষক অপেশাদার বা নন-প্রফেশনাল কাজে চরমভাবে ক্লান্ত, আর এই ব্যবস্থাগত ক্লান্তির পেছনে বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।
সংখ্যাটি শুধু অর্থের হিসাব নয়; এটি সময়, মনোযোগ ও শিক্ষার মান হারানোর হিসাবও।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী ও প্রধান শিক্ষকরা আজ কেবল শিক্ষক নন—তারা জরিপকারী, তথ্যসংগ্রাহক, প্রশাসনিক সহকারী, সামাজিক সমাবেশের সংগঠক। গবেষণায় শনাক্ত ৩৭ ধরনের অপেশাদার কাজের মধ্যে জরিপই সবচেয়ে বেশি সময় কেড়ে নিচ্ছে। গড়ে একজন শিক্ষক মাসে প্রায় ২৪ কর্মঘণ্টা ব্যয় করছেন এমন কাজে, যার সঙ্গে পাঠদানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। এর ফলাফল অনিবার্য—শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না।
এই মনোযোগহীনতার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। ৮৭ শতাংশ শিক্ষক স্বীকার করেছেন, শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো ঠিকমতো বুঝতে পারছে না। পরীক্ষার ফল খারাপ হচ্ছে, উপস্থিতি কমছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যেসব শিক্ষার্থী আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ‘রেমিডিয়াল ক্লাস’ নেওয়াই সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ, যে স্তর থেকে শিক্ষা বৈষম্য কমানোর কথা, সেখান থেকেই বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এখানে আরও নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। শিক্ষক শ্রমের সমমূল্যে প্রশাসনিক কাজে বছরে প্রায় ১ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে—যা কার্যত শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ হলেও শিক্ষার ফলাফলে রূপ নিচ্ছে না। একজন সহকারী শিক্ষক বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকার সমপরিমাণ শ্রম দিচ্ছেন এমন কাজে, যা অন্য কোনো জনবল বা ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক কম খরচে করা যেত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে ৯২ দশমিক ৬৯ শতাংশ ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এ ভুগছেন—যা কেবল ক্লান্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও পেশাগত বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এমন একজন শিক্ষক থেকে গুণগত শিক্ষা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
এখানে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র আসলে শিক্ষকের কাছ থেকে কী চায়? একজন শিক্ষককে যদি প্রশাসনিক ব্যবস্থার বহুমুখী চাহিদা মেটাতে হয়, তবে শ্রেণিকক্ষে তার মূল ভূমিকা কোথায় দাঁড়ায়? শিক্ষকের সময় ও মনোযোগ যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখন পাঠ্যবই, প্রশিক্ষণ বা নতুন কারিকুলাম—কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
গবেষণার সুপারিশগুলো তাই কেবল প্রযুক্তিগত নয়, দার্শনিকও। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ, একক ডিজিটাল পোর্টাল চালু, ক্লাস চলাকালীন তথ্য সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা—এসব প্রস্তাবের কেন্দ্রে আছে একটি মৌলিক ধারণা: শিক্ষকের সময় মানে শিক্ষার্থীর অধিকার।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যেও সেই স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই স্বীকৃতি কি নীতিতে রূপ নেবে? নাকি গবেষণা প্রতিবেদন হয়েই থেকে যাবে?
যদি শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ থেকে সরিয়ে রাখা হয়, তবে শিক্ষা সংস্কারের সব প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত অপেশাদার হয়ে পড়ে—এই সত্য মেনে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।