
বৈশাখ মানেই তপ্ত রোদে পোড়া মাটির সোঁদা গন্ধে মেশা একরাশ রঙের উৎসব। আর সেই উৎসবের প্রাণভোমরা হয়ে তিন দশক ধরে রাজপথ কাঁপাচ্ছে এক বর্ণিল শোভাযাত্রা। কখনো তা ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, কখনো তা বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দর্পণ।
সময়ের আবর্তে রাজনীতির জল ঘোলা হয়েছে, বহুবার বদলেছে এই শোভাযাত্রার নাম। কিন্তু ঢাকের কাঠি যখন আড়ংয়ে পড়ে, তখন কি আর সেই সুরের কোনো নাম থাকে?
২০১৬ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই শোভাযাত্রা আজ কেবল একটি শোভাযাত্রা বা মিছিল নয়, বরং বাংলাদেশের হৃদস্পন্দন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ‘নামকরণ’ নিয়ে যে টানাপোড়েন চলছে, তা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে আমাদের।
শেকড়ের খোঁজে: যশোর থেকে চারুকলা
এই শোভাযাত্রার গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে, সীমান্ত শহর যশোরে। শিল্পী মাহবুব জামিল শামীমের হাত ধরে ‘চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ প্রথমবার আয়োজন করে ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’। সেই যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলেছিল, তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণে।
তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের এক শৈল্পিক বিদ্রোহ ছিল এই আয়োজন। অধ্যাপক এ.এ.এম. কাওসার হাসানের ভাষায়, “সেটি ছিল ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব আন্দোলন।”
নাম-বদলের গোলকধাঁধা
ঢাকার রাজপথে যখন প্রথম এই মিছিল বের হয়, শিল্পী রফিকুন নবীর নেতৃত্বে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। ১০১ সদস্যের সেই কমিটিতে ছিলেন সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক এবং এমদাদ হোসেনের মতো মহীরুহরা। ১৯৯০ সালে শিল্পীদের ভাবনায় এলো—উৎসবের সাথে যদি ‘মঙ্গল’ শব্দটা যোগ হয়, তবে তা যেন পূর্ণতা পায়। জন্ম নিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
দীর্ঘ ৩৫ বছর এই নামেই বাঙালির প্রাণের উৎসবটি পরিচিত ছিল বিশ্বজুড়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেলে নামের গায়েও লাগে পরিবর্তনের হাওয়া। ২০২৫ সালের শুরুতে দাবি ওঠে, ফিরতে হবে আদি নামে। ‘মঙ্গল’ শব্দটি রাজনৈতিকভাবে কালিমালিপ্ত হয়েছে—এমন যুক্তিতে জুলাই আন্দোলনের পর এটিকে আবারও ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে ডাকার প্রস্তাব করা হয়।
সব বিতর্কের অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আসে চূড়ান্ত ঘোষণা। মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়ে দেন, ‘আনন্দ’ বা ‘মঙ্গল’ কোনোটিই নয়, বিতর্ক এড়াতে এটি এখন থেকে স্রেফ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
রঙের মোটিফে প্রতিবাদের সুর
নাম পাল্টালেও চারুকলার উঠোনে রঙের আস্তর কিন্তু ফিকে হয়নি। ২০২৫ সালের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য করা হয়েছে—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। ‘নববর্ষের সুরে ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। শিল্পীদের হাতের প্রতিটি ছোঁয়ায় লুকিয়ে আছে সমকালীন বারতা।
এবারের মোটিফগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন এক বাংলাদেশ। একটি বিশালাকার ‘মোরগ’—যা আঁধার শেষে গণতন্ত্রের নতুন ভোরের ডাক দিচ্ছে। সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যে গড়া ‘হাতি’, শান্তির সাদা ‘পায়রা’, আর গ্রামীণ বাংলার আদুরে ‘টেপা পুতুল-ঘোড়া’। তবে সবচেয়ে নজরকাড়া মোটিফটি হলো একটি ‘দোতারা’। এটি কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং বাউল সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রতিবাদ এবং লালন-সুফির গানের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।
বৈচিত্র্যের মহামিলন
এবারের শোভাযাত্রার বিন্যাসেও থাকছে ভিন্নমাত্রা। অশ্বারোহী পুলিশের দল যখন পথ দেখাবে, তখন তাদের পেছনে থাকবে জাতীয় পতাকা হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ প্রাণবন্ত শিক্ষার্থী। পেশাজীবী, সাংবাদিক আর শিক্ষকদের পাশাপাশি এবার রাজপথে একসাথে হাঁটবেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এবং জাতীয় কবিতা পরিষদের সদস্যরা।
শোভাযাত্রার শেষে ১৫০ ফুটের দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং আর ঢাকের তালের সঙ্গে যোগ দেবে সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী ও ১১৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। পাহাড়ি-সমতলের এই মেলবন্ধনই যেন বলে দেয়, বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে।
মুছে যাক গ্লানি
নামের রাজনীতি বা শব্দের মারপ্যাঁচে অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে, কিন্তু বাঙালির আবেগ কি বদলানো যায়? 'আনন্দ' হোক কিংবা 'মঙ্গল'—নামের পেছনে যে মানুষগুলোর শ্রম আর স্বপ্ন মিশে আছে, তাদের কাছে এটি কেবলই এক উৎসব। এই শোভাযাত্রা আসলে কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, কোনো বিশেষ নামের নয়। এটি এক মুক্ত মানুষের মিছিল, যারা প্রতি বছর বৈশাখের রোদে পুড়ে পুরোনো সব গ্লানি মুছে নতুন দিনের গান গায়। তাই দিনশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়— রাজপথ যখন বর্ণিল মোটিফ আর ঢাকের শব্দে মুখরিত হয়, তখন নামে কিবা এসে যায়!