
বিশ্বের পোশাকবাজার দ্রুত ম্যানমেইড ফাইবার বা মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক পণ্যের দিকে ঝুঁকলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো মূলত কটননির্ভর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৭২ দশমিক ৭ শতাংশই কটনভিত্তিক। বিপরীতে ম্যানমেইড ফাইবার ও অন্যান্য নন-কটন পণ্যের অংশ ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী স্পোর্টসওয়্যার, অ্যাক্টিভওয়্যার ও টেকনিক্যাল পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। ফলে কটনের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্যের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।
আইটিসির তথ্য বলছে, বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে কটনভিত্তিক পণ্যের গড় অংশ ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। সে তুলনায় বাংলাদেশের কটননির্ভরতা প্রায় দ্বিগুণ। প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কটননির্ভর পাকিস্তান ও ভারত—যাদের কটনভিত্তিক রপ্তানির অংশ যথাক্রমে ৮৫ দশমিক ১ ও ৭৪ শতাংশ।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানিতে নন-কটন ও ম্যানমেইড ফাইবারের অংশ ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ, চীনে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। এসব দেশ কটনের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্যের উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে।
তবে বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালে দেশের পোশাক রপ্তানিতে ম্যানমেইড ফাইবারের অংশ ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। এক দশকের ব্যবধানে তা বেড়ে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ নন-কটন পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ ঘটলেও এ ক্ষেত্রে আরও দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মতে, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও পণ্য উদ্ভাবনের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখনো প্রচলিত কটনপণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এতে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কটন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম শক্তি এবং এটি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে না। তবে নন-কটন পণ্যে প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলে বাংলাদেশকে শুধু পরিমাণের প্রতিযোগিতা থেকে মূল্য সংযোজনের প্রতিযোগিতায় যেতে হবে।
তিনি নন-কটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সিনথেটিক ও টেকনিক্যাল ফাইবারের প্রসেসিং, ডাইং ও ফিনিশিং সক্ষমতা উন্নয়ন, দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নন-কটন খাতে যেতে হলে শুধু পোশাক তৈরির সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। ফাইবার, সুতা ও কাপড়ের প্রসেসিং, ডাইং-ফিনিশিং, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল, গবেষণা ও পণ্য উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ম্যানমেইড ফাইবারের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি সুবিধা ও বিনিয়োগ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। তাই কম খরচে বেশি পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা জরুরি।