ভূমিকম্পে বারবার কাঁপছে দেশ, তীব্র ঝুঁকিতে ঢাকা?

ফানাম নিউজ
  ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩

দেশে আবারও অনুভূত হয়েছে ভূমিকম্প। শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার (৪ অক্টোবর) ভোরের মধ্যে দুই দফায় কেঁপে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম কম্পন অনুভূত হয় রাত ১২টা ১২ মিনিটে। দ্বিতীয়টি হয় ভোররাত ৪টা ১০ মিনিটে। দুটি ভূমিকম্পেরই মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ৮। ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৪৪৩ কিলোমিটার দূরে।

দুই দফার এই কম্পনে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বারবার এমন কম্পন কি কেবল স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি এর আড়ালে বড় কোনো ঝুঁকির ইঙ্গিত রয়েছে?

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বলছে, ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে বাংলাদেশ যে সামগ্রিকভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগও নেই। আর বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হয়ে উঠতে পারে রাজধানীর অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো।

কেন বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে?

ভূমিকম্পের মূল কারণ পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলোর ক্রমাগত নড়াচড়া। বাংলাদেশ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের পারস্পরিক চাপ ভূকম্পন সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবিরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরে হিমালয় অঞ্চলে ভারতীয় প্লেট ইউরেশীয় প্লেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক ছোট বার্মা প্লেটও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে চাপ তৈরি করছে। এই ভূ-চাপের ফলেই বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে।

অর্থাৎ, দেশে মাঝেমধ্যে ৪ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়া ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

ঢাকার কাছেই ভূমিকম্প—কেন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে?

উদ্বেগের জায়গাটি তৈরি হয়েছে মূলত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলগুলোর অবস্থান নিয়ে।

গত দুই বছরে ঢাকার আশপাশে একাধিক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত হয়েছে। নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মতো ঢাকার কাছাকাছি এলাকাতেও ভূমিকম্পের কেন্দ্র পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ঢাকার আগারগাঁও থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে রূপগঞ্জে একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার আশপাশে এসব কম্পনের অর্থ এই নয় যে রাজধানীর নিচে বড় কোনো সক্রিয় ফল্ট লাইন তৈরি হয়েছে বা শিগগিরই বড় ভূমিকম্প আসছে।

রুবাইয়াত কবিরের মতে, ঢাকা ও এর আশপাশের প্রায় ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার এলাকায় বড় ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক রেকর্ড নেই। বড় মাত্রার ভূমিকম্পের জন্য সাধারণত বড় ধরনের ফল্ট বা চ্যুতির প্রয়োজন হয়, যার সুস্পষ্ট প্রমাণ ঢাকার আশপাশে পাওয়া যায়নি।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর বক্তব্যও অনেকটা একই। তাঁর মতে, ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো স্থানীয় ফল্টের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে এবং এসব ভূমিকম্পকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

কিন্তু ঝুঁকি কি একেবারেই নেই?

এখানেই বাংলাদেশের ভূমিকম্প পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে।

ঢাকার আশপাশে বড় ফল্ট লাইনের অস্তিত্ব না থাকলেও বাংলাদেশ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যার আশপাশে শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টির সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সিলেটের কাছে ডাউকি ফল্ট কিংবা ভারতের আসাম অঞ্চলের শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রভাব বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায় ব্যাপকভাবে পড়তে পারে।

অতীতের ইতিহাসও এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেয় না।

১৮৬৯ সালে আসামের কাছাড়ে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল ভূমিকম্পে ৭ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ এবং ১৯৩০ সালে আসামের ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের আশপাশের অঞ্চল অতীতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎস হয়েছে। ফলে ঝুঁকির প্রশ্নটি শুধু ‘ঢাকার নিচে ফল্ট আছে কি না’—এই একটি প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সবচেয়ে বড় বিপদ ভূমিকম্প, নাকি ভবন?

ভূমিকম্প নিজে যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়ে বড় বিপদ তৈরি করতে পারে দুর্বল অবকাঠামো।

অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে বিপুলসংখ্যক ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাইকা ও সিডিএমপির জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে।

ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনার সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এর বড় একটি অংশ ছোট ভবন বা টিনশেড হলেও প্রায় ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবনকে সম্ভাব্য বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এসব ভবনের অন্তত ৪০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এখানেই ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—**একটি ভূমিকম্প কতটা বড় হবে, তার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে ভবনগুলো কতটা নিরাপদ তার ওপর।**

গত বছরের ভূমিকম্প কী শিক্ষা দিয়েছে?

গত বছরের ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। প্রায় ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী ওই ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে ১০ জনের মৃত্যু এবং কয়েক শ মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

মাত্রা ৫ দশমিক ৭—বিশ্বের অনেক অঞ্চলের জন্য এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও দুর্বল ভবন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে এমন ভূমিকম্পও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

এটি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু বড় ভূমিকম্পের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। মাঝারি মাত্রার কম্পনেও যদি ভবন, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, গ্যাসলাইন কিংবা নগর অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ থাকে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি বড় হতে পারে।

৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার কী হতে পারে?

অধ্যাপক আনসারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি দীর্ঘমেয়াদি পুনরাবৃত্তি চক্র রয়েছে। তবে ৭ বা ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা যেকোনো সময় উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ ধরনের ভূমিকম্প ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতি শুধু ভবন ধসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

একসঙ্গে বিপর্যস্ত হতে পারে—

- আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন
- বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা
- পানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো
- সড়ক ও সেতু
- হাসপাতাল ও জরুরি সেবা
- ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারব্যবস্থা
- নগরীর যান চলাচল

সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে উদ্ধারকাজে পৌঁছানো। সরু রাস্তা, ঘনবসতি ও অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে একটি এলাকায় ভবন ধসে পড়লে একই সময়ে পাশের এলাকাগুলোতেও উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রস্তুতির জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি

ভূমিকম্প কখন হবে—এটি নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। ফলে ভূমিকম্প প্রতিরোধের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক আনসারীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই—ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি শুধু ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা উদ্ধারযন্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

মূল প্রস্তুতি শুরু করতে হবে ভবন নির্মাণ থেকে।

নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা নিশ্চিত করা, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় ভবনে রেট্রোফিটিং করা এবং নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন করা—এসবকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

কারণ, ভূমিকম্প থামানোর ক্ষমতা মানুষের নেই; কিন্তু ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতিই সমাধান

৪ দশমিক ৮ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া স্বস্তির বিষয়। ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ছোট ভূমিকম্পগুলোও বিশেষজ্ঞদের মতে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত।

বরং বারবার অনুভূত হওয়া ছোট ও মাঝারি কম্পনগুলোকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে—ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে নয়, প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হিসেবে।

রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক বহুতল ভবন, ঘনবসতি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের বাস্তবতায় বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে আমাদের প্রস্তুতির ওপর।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কবে ভূমিকম্প হবে?’ নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভূমিকম্প হলে আমাদের ভবনগুলো কতটা নিরাপদ থাকবে, উদ্ধারব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে এবং একটি বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা কতটা প্রস্তুত?

কারণ বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ভূমিকম্প মানুষকে সরাসরি হত্যা করে না; দুর্বল ভবনই ভূমিকম্পকে প্রাণঘাতী করে তোলে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়