শ্রমিক আন্দোলন: অর্থায়নে ইলিয়াস-কচি-জাহাঙ্গীর, সমন্বয়ে আলিফ-জুয়েল

ফানাম নিউজ
  ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৪

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুরে নাশকতার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম বিদেশে বসে অর্থের জোগান ও নির্দেশনা দিচ্ছেন। ঢাকায় তাঁদের হয়ে লোক সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইলিয়াস মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল।

পুলিশের দাবি, শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নেওয়া, মিছিল করা, টায়ারে আগুন দেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য আলাদা অঙ্কের টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এসব কাজের ছবি ও ভিডিও পাঠানোর পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হতো।

গত রোববার মিরপুর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ২৬ নেতাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাঁদের মোবাইল ফোন যাচাই করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শ্রমিকের ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভে অংশ নিতে বলা হয়েছিল। আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশনায় নাশকতার জন্য লোকজন জড়ো করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, মিছিলে অংশ নিলে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, টায়ারে আগুন দিলে ৩ হাজার টাকা এবং গাড়ি বা স্থাপনায় আগুন দিলে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্যও পেয়েছেন কর্মকর্তারা।

কাজের প্রমাণ হিসেবে ছবি বা ভিডিও পাঠানো ছিল টাকা পাওয়ার অন্যতম শর্ত। কয়েকজন গ্রেপ্তার ব্যক্তি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পেয়েছেন বলেও দাবি ডিবির।

ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ রংমিস্ত্রি, কেউ রিকশাচালক, কেউ রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন; আবার কেউ ফুটপাতে দোকান করেন। তাঁদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন অ্যাপসে ভিন্ন ভিন্ন নামে ২০ থেকে ২৫টি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এসব গ্রুপে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থান ও তৎপরতার তথ্য দিতেন।

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশ থেকে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে নির্দেশনা দিতেন এস এম মান্নান কচি, জাহাঙ্গীর আলম ও ইলিয়াস মোল্লাহ। ঢাকায় তাঁদের হয়ে লোকবল সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ করছিলেন ইলিয়াস মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল।

জুয়েলের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। তিনি দীর্ঘদিন জাহাঙ্গীরের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আলিফ মোল্লাহকে গ্রেপ্তারে ডিবি বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শ্রমিকদের আন্দোলনে যোগ দিয়ে নাশকতার উদ্দেশ্যে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মীকে জড়ো করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কক্সবাজার, নোয়াখালী ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী রয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকে নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক ও দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলসহ নানা কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের দাবি, গত রোববার মিরপুর ১০ নম্বরে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে অনলাইন গ্রুপে বার্তা পাঠান ইলিয়াস মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ। তিনি নেতাকর্মীদের মিরপুর ২ নম্বরের লাভ রোডে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন। পরে সেখান থেকে তাঁদের মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে পাঠানো হয়।

পুলিশ সংঘর্ষ সামাল দিতে ব্যস্ত থাকার সুযোগে মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। পরে ওই ঘটনার ছবি ও ভিডিও আলিফের কাছে পাঠানো হয় বলেও জানান তাঁরা।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে রাজিব চন্দ্র দাস নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পরে তাঁকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রাজিব প্যারাগন গ্রুপের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত রোববার মিরপুর ১১ নম্বরে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ থেকে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মিরপুরের তিন থানায় চারটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলাগুলোতে অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ এবং সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এসব মামলায় দুই দিনে থানা পুলিশ ও ডিবি অন্তত ৫০ জন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গত রোববার গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ জনকে সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এদিকে একই দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো সোমবারও মিরপুরে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। তবে তাঁদের সড়কে নামতে বাধা দেয় পুলিশ। দুই দফায় আন্দোলনকারীরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে ধাওয়া দিয়ে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার বলেন, পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করে আরও কয়েকটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম ও প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে দুষ্কৃতকারীরা রয়েছে। যারা আইন অমান্য করছে, আইন লঙ্ঘন করছে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে, তারা পুলিশের দৃষ্টিতে অপরাধী। তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

শ্রমিকদের সামনে রেখে নাশকতাকারীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সোমবার সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন ধরে পতিত স্বৈরাচারের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়ক-মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে ও অবরোধ সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। অথচ প্রকৃত শ্রমিক ও তাঁদের সংগঠনের নেতারা কখনোই নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক বা শিল্পকারখানায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হোক, তা চান না।

তিনি আরও বলেন, সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত ইন্ধনদাতা এবং কয়েকজন শিল্পমালিককে ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অডিও-ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়