
সৌরজগতের বাইরের কিছু গ্রহে প্রাণের বিকাশ ও টিকে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘সুপার-আর্থ’ নামে পরিচিত পৃথিবীর চেয়ে বড় আকারের কিছু পাথুরে গ্রহ ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে নিজেদের রক্ষার মতো শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এতে এসব গ্রহে প্রাণধারণের অনুকূল পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকার সম্ভাবনা বাড়ছে।
সুপার-আর্থ বলতে এমন গ্রহকে বোঝানো হয়, যার আকার পৃথিবীর চেয়ে বড়, তবে নেপচুনের চেয়ে ছোট। এখন পর্যন্ত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আবিষ্কৃত ভিনগ্রহগুলোর মধ্যে এই শ্রেণির গ্রহের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, এদের অনেকগুলোই নিজ নিজ নক্ষত্রের ‘বাসযোগ্য অঞ্চলে’ অবস্থান করছে—যে অঞ্চলে তরল পানির অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। তরল পানি প্রাণের জন্য অপরিহার্য হওয়ায় এসব গ্রহে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক সুপার-আর্থ পৃথিবীর মতো কেন্দ্রভাগ থেকে নয়, বরং কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মাঝামাঝি থাকা গলিত পাথরের একটি স্তর থেকে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এই চৌম্বক ক্ষেত্র নক্ষত্র থেকে আসা প্রবল কণাপ্রবাহ ও বিকিরণ থেকে গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করতে সক্ষম।
নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান লেখক মিকি নাকাজিমা বলেন, ‘কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গবেষণা বলছে, সুপার-আর্থগুলো তাদের অভ্যন্তরের ম্যাগমা স্তর থেকেই এমন চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যা তাদের বাসযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।’
গবেষণাটি চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার অ্যাস্ট্রোনমি-তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলেছে—পৃথিবীর তুলনায় ভিন্ন অভ্যন্তরীণ গঠন থাকা সত্ত্বেও সুপার-আর্থগুলো কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখতে পারে।
নেচার অ্যাস্ট্রোনমি-এর সিনিয়র সম্পাদক লুকা মালতাগলিয়াতি এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ভিনগ্রহগুলোর ক্ষেত্রে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির নিয়ম পৃথিবীর মতো হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যেসব গ্রহের ভর পৃথিবীর চেয়ে তিন থেকে ছয় গুণ বেশি, তাদের ক্ষেত্রে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির প্রধান উৎস কেন্দ্রভাগের বদলে কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মধ্যবর্তী কোনো স্তরে অবস্থান করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী চৌম্বকীয় ঢাল ছাড়া কোনো গ্রহে প্রাণের টিকে থাকা কঠিন। কারণ, এই ঢাল গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে নক্ষত্রের তীব্র বায়ুপ্রবাহ ও মহাজাগতিক বিকিরণের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এমন সুরক্ষা না থাকলে বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থান করলেও কোনো গ্রহ ধীরে ধীরে তার বায়ুমণ্ডল হারাতে পারে।
পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায় ৩০০ কোটি বছরের বেশি সময় ধরে সক্রিয় রয়েছে, যা মূলত গ্রহের তরল লোহার কেন্দ্রের গতিশীলতার ফলে সৃষ্টি। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, সুপার-আর্থের মতো বড় গ্রহগুলোর কেন্দ্রভাগ পুরোপুরি কঠিন বা পুরোপুরি তরল হতে পারে। এতে পৃথিবীর মতো প্রথাগত উপায়ে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ব্যাখ্যা হিসেবে গবেষক দল ‘বাসাল ম্যাগমা ওশেন’ বা বিএমও নামের একটি বিকল্প প্রক্রিয়ার কথা তুলে ধরেছেন। এটি হলো কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মাঝামাঝি থাকা আয়রনসমৃদ্ধ গলিত পাথরের স্তর, যা বিদ্যুৎ পরিবাহী হয়ে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তুলনায় তিন থেকে ছয় গুণ বেশি ভরের সুপার-আর্থগুলো কয়েক শ কোটি বছর ধরে এই বিএমও-চালিত চৌম্বক ক্ষেত্র বজায় রাখতে সক্ষম। কিছু ক্ষেত্রে এসব গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, ভিনগ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র সরাসরি শনাক্ত করা এখনো কঠিন। তবে ভবিষ্যতের উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। এতে সৌরজগতের বাইরে প্রাণের অনুসন্ধান নতুন মাত্রা পাবে।
সূত্র: স্পেসডটকম