
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেয়াকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল সংসদ। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে প্রায় ৫ মিনিট বিক্ষোভের পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের জন্য সংসদে আমন্ত্রণ জানালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম কিছু বলার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্পিকার মাইক না দিলে নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিলার ইন দা পার্লামেন্ট!’ তিনি ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানান। এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সব সদস্য নানা বক্তব্য দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে শুধু জামায়াতের আমির তাঁর আসনে বসে ছিলেন। স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতেই থাকেন।
একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ বলে স্লোগান দেন। এই হইচইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদে স্পিকারের আসনের পাশে আসেন। স্পিকার তাঁকে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানান। তখনো বিক্ষোভ চলছিল। একপর্যায়ে স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে তাঁর ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য সংসদ সদস্যরা ‘গেট আউট, গেট আউট’ বলে স্লোগান দেন। এ সময় কিছু সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিরোধী দলের সদস্যরা ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘স্বৈরাচারের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘ফ্যাসিবাদ আর গণতন্ত্র, একসাথে চলে না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শুরু করেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ‘লজ্জা লজ্জা’ হলে বিদ্রূপ করেন।
স্পিকার এ সময় বারবার সংসদ সদস্যদের প্রতি সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করার আহ্বান। কিন্তু বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। শেষে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ‘ওয়াকআউট’ করার ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।
অন্যদিকে ভাষণ চালিয়ে যেতে থাকেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হয়। এর পরপরই অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার। বিরোধীদলীয় সদস্যরা আর সংসদ অধিবেশনে যোগ দেননি।

আগামী ১৫ মার্চ সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
রোববার পর্যন্ত সংসদ মুলতবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আগামী রোববার (১৫ মার্চ) সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে তিনি এই ঘোষণা দেন।
এর আগে সংসদের কার্যসূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে আহ্বান জানান স্পিকার। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘গণতন্ত্র চাই, ফ্যাসিজম নয়’ এবং ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ করো’।
স্পিকার একাধিকবার সদস্যদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। তবে স্লোগান অব্যাহত থাকায় একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি ও ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন।
বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি তার লিখিত ভাষণ পাঠ করেন। ভাষণে তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপি ও তাদের মিত্রদের অভিনন্দন জানান। শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় সরকারি বেঞ্চের সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।
সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি রাষ্ট্রপতির সমালোচনা করে বলেন, জুলাইয়ের সহিংসতার সময় রাষ্ট্রপতি কার্যকর ভূমিকা নেননি। তার ভাষায়, ‘সে সময় তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগী ছিলেন। তাই এই সংসদে বক্তব্য দেওয়ার নৈতিক অধিকার তার নেই।’
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে স্পিকার অধিবেশন আগামী রোববার সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপতির ৩ অপরাধে ভাষণ বর্জন করেছি : জামায়াত আমির
রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রপতির তিন অপরাধে তার ভাষণ বর্জন করা হয়েছে। তার বক্তব্য এই মহান সংসদে আমরা শুনতে পারি না।
বিকেলে সংসদ থেকে বেরিয়ে তিনি একথা বলেন।
ওয়াক আউট শেষে সাংবাদিকদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সংসদ জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, এই সংসদে ফ্যাসিস্টের দোসর, খুনির কোনো দোসর যেন বক্তব্য রাখতে না পারে।
'এই প্রেসিডেন্ট তিনটা কারণে অপরাধী। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন’, বলেন তিনি।
তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অর্ডিন্যান্স স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবে তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন। এই শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি।

ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনেই ৫ কমিটি গঠন, নেতৃত্বে স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে এই কমিটিগুলো অনুমোদিত হয়।
এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজে কার্য উপদেষ্টা ও সংসদ কমিটির ঘোষণা দেন। অন্যদিকে বিশেষ কমিটি, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটি এবং বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটির নাম প্রস্তাব করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
সংসদ পরিচালনায় নীতিনির্ধারণী এই কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। কমিটির সদস্যরা হলেন— সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এটিএম আজহারুল ইসলাম, নাহিদ ইসলাম ও নওশাদ জামির।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে জয়নাল আবদিনকে।
কমিটির উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হলেন— মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমদ, নূরুল ইসলাম মনি, ড. এম ওসমান ফারুক ও এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ।
এর আগে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করেন। তালিকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি তহবিল অধ্যাদেশ ২০২৫, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা রহিতকরণ অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রয়েছে।
বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটির সভাপতিও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান, কায়সার কামাল, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নূরুল ইসলাম মনি, জয়নাল আবদিন ফারুক ও নাহিদ ইসলাম। এই কমিটিতে বিরোধী দল থেকে আরও একজন সদস্য পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সংসদ ও বেসরকারি সদস্য বিল কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। সদস্য হিসেবে আছেন রাকিবুল ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু ও কায়ছার আহমদসহ ১১ জন।
বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব কমিটির সভাপতি হয়েছেন মো. শাহজাহান। সদস্যরা হলেন— আসাদুজ্জামান, আমান উল্লাহ আমান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, তাহসিনা রুশদী ও আখতার হোসেন প্রমুখ।
সংসদীয় কার্যসূচিতে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা আইন সংশোধন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস সংশোধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পাসের অপেক্ষায় রয়েছে।

খালেদা জিয়া মানেই আপসহীন গণতন্ত্র আর সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী: মির্জা ফখরুল
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশপ্রেম ও সাহসিকতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন বিএনপি মহাসচিব ও সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনোই কারও সঙ্গে আপস করেননি।
জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যে তিনি খালেদা জিয়ার শাসনমলে গৃহীত বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শুরুতে মির্জা ফখরুল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবে জীবন উৎসর্গকারী তরুণদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, আমাদের ছেলেরা একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য প্রাণ দিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।
খালেদা জিয়ার শাসনকালের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের ভিত্তি তিনিই গড়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, উন্মুক্ত ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের অনুমতি ছিল তার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
কৃষি ও অর্থনীতিতে বেগম জিয়ার অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষকদের ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মকুফ এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ করে তিনি গ্রামবাংলার মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছিলেন। তার হাত ধরেই মুক্তবাজার অর্থনীতি ও স্বনির্ভর অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল।
মির্জা ফখরুল বলেন, কারামুক্ত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া কোনো প্রতিহিংসা নয়, বরং ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন— ‘আসুন আমরা ভালোবাসার বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’ বিএনপি মহাসচিব স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বেগম জিয়ার এই দর্শনই আমাদের আগামীর পথ চলার প্রেরণা।

শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত
গণতন্ত্রের মা বেঁচে থাকবেন মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আজকে ‘গণতন্ত্রের মা’ আমাদের মাঝে নেই, তবে তিনি দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে চলা অধিবেশনে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ এই সংসদে উপস্থিত থাকলে আমরা সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। তিনি যতবার যতগুলো আসনে নির্বাচন করেছেন, সবকটিতেই জয়লাভ করেছেন। এটিই প্রমাণ করে দেশের মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা কতটা আকাশচুম্বী।
তিনি আরও যোগ করেন, আজকে সেই গণতন্ত্রের মা সশরীরে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষের মাঝে আছেন। গণতন্ত্রের লড়াইয়ে তিনি আজীবন অনুপ্রেরণা হিসেবে জীবিত থাকবেন। এসময় তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জামায়াতের এটিএম আজহারুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, খালেদা জিয়ারসঙ্গে আমরা দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। তিনি দেশের স্বার্থে সবসময় অটল ও আপসহীন ছিলেন। এসময় তিনি সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানেই নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা। আমরা জুলাই গণহত্যার বিচার চাই এবং একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত, মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ গড়তে চাই।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
আলোচনায় আরও অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম।
আলোচনা শেষে সংসদে আনীত শোক প্রস্তাবগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সবশেষে মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)।

হাজারো শহীদের রক্তে ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে: রাষ্ট্রপতি
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে তাবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন, পাঁচ শতাধিক মানুষ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। সরকার আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ১২৪৩টি স্বাস্থ্য কার্ড প্রদান করেছে এবং গুরুতর আহত ১৩৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছে।
তিনি আরও জানান, শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে ৬৪ জেলায় স্মৃতিস্তম্ভ এবং ঢাকায় জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ এই মহান সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করে বলেন, তিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা সামনের দিনগুলোতে আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪.৭৮ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারের অনিয়ম তদন্তে কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারে একটি পৃথক কমিশন গঠন করা হবে যারা ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হওয়া সকল অনিয়ম তদন্ত করবে।

আমার কাছে সরকারি-বিরোধী দল আলাদা কিছু নয়: স্পিকার
জাতীয় সংসদ পরিচালনায় পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, সংসদের অভিভাবক হিসেবে তার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু নয়। তিনি ঘোষণা করেন, সংসদের কার্যক্রমে ইনসাফ কায়েম করা এবং বিরোধী দল যাতে কার্যকর ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে, সে বিষয়ে তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন।
স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি নিজের নিরপেক্ষতা প্রমাণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি এর স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
তিনি বলেন, ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থই হবে এই সংসদের মূল চালিকাশক্তি। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে সংসদকে দেশের সকল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মূলমন্ত্র নিয়ে সংসদ সদস্যদের কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নব নির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে শপথ পড়ালেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দুপুরে এ শপথ পড়ানো হয়। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এই শপথ পড়ানো হয়। তার আগে সংসদ সদস্যের হ্যাঁ ভোটে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হয়।

স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজ থেকে আপনারা কোনো দলের নন, আপনারা এই মহান জাতীয় সংসদের অভিভাবক। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে সংসদকে অধিকার লঙ্ঘনকারীদের ক্লাবে পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু আজকের এই সংসদ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সংসদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে যারা নিজেদের এমপি পরিচয় দিয়েছিলেন, তারা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। আজ দেশের স্বাধীনতা প্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষ এই সংসদের দিকে এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা এই সংসদকে অর্থবহ করতে চাই।

হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি দায়বদ্ধ সংসদ পেয়েছি: প্রধানমন্ত্রী
দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন ও ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে জাতীয় সংসদ হবে দেশের সব যুক্তি-তর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম সভাপতি হিসেবে প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতার শুরুতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না আর হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা একটি দায়বদ্ধ সংসদ পেয়েছি। যারা গুম, খুন এবং আয়নাঘরের মতো বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের সাহসিকতাতেই আজ দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রদূত উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিগত শাসনামলে সেই সংসদকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। তিনি আপসহীনভাবে লড়াই করেছেন, কিন্তু এই শুভ মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি। আমরা তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
একইসঙ্গে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তবে আমি সেই দলেই আছি। ব্যক্তি বা দলের চেয়ে জনগণের স্বার্থই বড়—এটাই বিএনপির মূল দর্শন।
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, আমি দলীয়ভাবে নির্বাচিত হলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই সংসদে সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি সার্বভৌম, নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। তিনি প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সব সংসদ সদস্যের সহযোগিতা কামনা করেন।
বর্তমান সংসদের বিশেষ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জনরোষে সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারদের কাউকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা হয় কারাগারে, না হয় পলাতক।
এই সংকটকালীন অধিবেশনে সভাপতিত্বের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭৩ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানও মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। আজকের এই নজিরবিহীন প্রেক্ষাপটে আমরা প্রবীণ সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে কার্যক্রম শুরু করছি।

সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন ঢাকার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা। বিদেশি দূতরা সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন।
ঢাকার কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন।
ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন। তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করায় বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন। অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়ার প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
ঢাকার ফ্রান্স দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফ্রেডেরিক ইনজা বলেন, বাংলাদেশের ১৩তম সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিতে পেরে আনন্দিত। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দেশের স্থায়ী অঙ্গীকারের প্রতিফলন। আমরা নবনির্বাচিত সংসদের বাংলাদেশের জনগণের সেবা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য একটি ফলপ্রসূ এবং সফল যাত্রা কামনা করি।
ঢাকার কানাডীয় হাইকমিশন এক বার্তায় জানিয়েছে, ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাই কমিশনার অজিত সিং সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। এটা বাংলাদেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই ঐতিহাসিক অধিবেশন উদ্বোধন প্রত্যক্ষ করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করেছেন।
এ ছাড়া, বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরল্ড গুলব্রান্ডসেন, নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্স কর স্টুটেন প্রমুখ যোগ দেন।

বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
অধিবেশনের শুরুতেই বর্তমান রাষ্ট্রপতি বা স্পিকারের (প্রেক্ষাপট অনুযায়ী) পক্ষ থেকে এই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
শোক প্রস্তাব উত্থাপনকালে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর আমরা হারিয়েছি তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় তার অবদান চিরস্মরণীয়। সংসদ তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশি নেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে সংসদ। এ তালিকায় রয়েছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। অধিবেশনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ডা. এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ মোট ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয়। তাদের জীবনবৃত্তান্ত সম্বলিত শোক প্রস্তাব সংসদে পাঠ করা হয়।
শোক প্রস্তাব উত্থাপনের পর প্রয়াতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে সংসদে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর শোক প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়। সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, এই শোক প্রস্তাবের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রথম অধিবেশনের সভাপতি খন্দকার মোশাররফ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নাম প্রস্তাব করেন। পরে দলের পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেটি সমর্থন জানান। তারপর এ সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলামী নায়েবে আমির সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ তাহের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সমর্থন জানান। বেলা ১১টার পর শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন।