জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ

ফানাম নিউজ
  ১০ মার্চ ২০২৬, ১৪:৪৫

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ইতোমধ্যে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সরবরাহ ও মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাধারণ সময়ে বাংলাদেশে দৈনিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার টন। এর মধ্যে ডিজেলই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়—প্রায় ১২ হাজার টন। পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ১২০০ টন এবং অকটেনের চাহিদা প্রায় ১১০০ টন। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এই চাহিদা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

বিশেষ করে ৭ মার্চের বিক্রির পরিসংখ্যান পরিস্থিতির পরিবর্তনকে স্পষ্ট করে। গত বছর একই সময়ে যেখানে ডিজেল বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার টন, সেখানে এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৯০০ টনে। পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অনেক পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ী আগাম জ্বালানি কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন। ফলে স্বাভাবিক বাজারের চাহিদার বাইরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

এই অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতেই সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল বিক্রি করা যাবে না। একই সঙ্গে ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পে সরবরাহও কিছুটা কমানো হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এতে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা কমবে এবং সীমিত মজুত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ডিজেল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বেশি।

বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। দৈনিক প্রায় ৯ হাজার টন সরবরাহ ধরে হিসাব করলে এই মজুত প্রায় ১৩ দিন চলতে পারে। তবে আগামী ১৩ মার্চের মধ্যে পাঁচটি জাহাজে আরও প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টন ডিজেল দেশে আসার কথা রয়েছে।

এই চালান যুক্ত হলে মোট মজুত দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অর্থাৎ আপাতত বড় ধরনের সংকট না থাকলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়।

পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে চিত্র আরও অস্বাভাবিক। যেখানে গত বছর একই সময়ে পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল মাত্র দেড় হাজার টনের মতো, সেখানে এবার তা বেড়ে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ টনে পৌঁছেছে। অকটেন বিক্রিও প্রায় দশ গুণ বেড়েছে।

বর্তমান মজুত ও রেশনিং অনুযায়ী পেট্রোল প্রায় ১৭ দিন এবং অকটেন প্রায় ২৫ দিন সরবরাহ করা সম্ভব। তবে এসব জ্বালানির বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হওয়ায় তা দ্রুত মজুত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দেশীয় রিফাইনারি ও কনডেনসেট শোধনাগার থেকে নতুন সরবরাহ যুক্ত হলে সংকট কিছুটা কমতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এর পাশাপাশি বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত তেল সরাসরি আমদানি করা হয়।

এই পরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে ভারত ও চীন থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই সরবরাহ শৃঙ্খলেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ ভারত ও চীনের অনেক রিফাইনারি তুলনামূলক কম দামে ইরান থেকে তেল কিনে তা পরিশোধন করে।

ফলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশও পরোক্ষভাবে সরবরাহ সংকটে পড়তে পারে।

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী দেশে বিভিন্ন জ্বালানি তেলের মজুত কয়েক সপ্তাহের চাহিদা মেটানোর মতো রয়েছে। তবে চাহিদা যদি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তেই থাকে, তাহলে এই মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মজুত সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো কঠিন।

অতএব, বর্তমান সংকট কেবল একটি সাময়িক বাজার পরিস্থিতি নয়—বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়