খামেনির মৃত্যু : ইরানের শাসনব্যবস্থা কি ভেঙে পড়বে?

ফানাম নিউজ
  ০২ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৯
আপডেট  : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৩

যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনাটি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত। এই ঘটনার পর খামেনির সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এবং তারা প্রতিবাদ শুরু করেছেন।

১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশটির আমূল পরিবর্তন ও নীতিনির্ধারণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রোববার ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া এখন ইরানের ‘পবিত্র দায়িত্ব এবং বৈধ অধিকার’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ইরানের জন্য একটি ‘মুক্তির মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, শরীরের ‘মাথা’ (শীর্ষ নেতৃত্ব) সরিয়ে দিলে পুরো দেহ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। তবে ইরানের বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা— বিষয়টি হয়তো ট্রাম্পের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

সামরিক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার (Decapitation) মাধ্যমে পশ্চিমারা যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে, তা হিতে বিপরীত হতে পারে। এর ফলে ইরান ভেঙে না পড়ে বরং একটি ‘গ্যারিসন স্টেট’ বা চরম সামরিকায়িত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে কোনো রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার বালাই থাকবে না।

নেতৃত্ব শূন্যতার সীমাবদ্ধতা

মার্কিন অভিযানের মূল ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে, ইরান রাষ্ট্র হিসেবে এতটাই ভঙ্গুর যে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে এটি টিকে থাকতে পারবে না। সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ‘ঠিক জানেন’ তেহরানে কারা কলকাঠি নাড়েন এবং খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো ‘ভালো কিছু প্রার্থী’ তার নজরে আছে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।

সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ (Regime Change) সম্ভব নয়। সাবেক মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব মাইকেল মুলরয় আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পদাতিক বাহিনী বা ভেতর থেকে কোনো সশস্ত্র অভ্যুত্থান ছাড়া শুধু ওপর থেকে বোমা ফেলে একটি দেশের গভীর নিরাপত্তা কাঠামো ধ্বংস করা যায় না। যদি একজন লোকও কথা বলার জন্য বেঁচে থাকে, তবে বুঝতে হবে শাসনব্যবস্থা এখনও আছে।’

ইরানের এই টিকে থাকার ক্ষমতার মূলে রয়েছে তাদের দ্বিমুখী সামরিক কাঠামো। দেশটির সুরক্ষা শুধু নিয়মিত সেনাবাহিনী দেয় না, বরং রয়েছে ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)—যাদের মূল কাজই হলো ইসলামি বিপ্লব ও এর আদর্শকে রক্ষা করা। তাদের সাথে যোগ দেয় ‘বাসিজ’ নামক বিশাল এক স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী, যারা ইরানের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে আছে এবং যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে প্রশিক্ষিত।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না কি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা?

তেহরান-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসেইন রোয়ভারান নিশ্চিত করেছেন যে, হামলায় খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানিসহ শীর্ষ স্তরের নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজনী জানিয়েছেন, নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

লারিজনী বলেন, ‘খুব দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কাউন্সিল গঠন করা হবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের একজন ফকিহ (আইনবিদ) পরবর্তী নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই কাউন্সিল গঠনের কাজ আজকের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই সিস্টেমটি ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ নয় বরং ‘প্রাতিষ্ঠানিক’। অর্থাৎ এটি এমনভাবে ডিজাইন করা যে, শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকলেও এটি ‘অটো-পাইলট’ মোডে চলতে সক্ষম। মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের সিনিয়র ফেলো আব্বাস আসলানি বলেন, ‘কর্মকর্তারা পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার এবং স্থিতিশীলতা দেখানোর চেষ্টা করছেন। তবে সাধারণ ইরানিরা এই উত্তেজনার ক্রমাগত বৃদ্ধিতে শঙ্কিত।’

ধর্মতন্ত্র থেকে জাতীয়তাবাদ : টিকে থাকার নতুন কৌশল

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের শাসনব্যবস্থা তাদের বৈধতার ভিত্তি ধর্ম থেকে সরিয়ে ‘বেঁচে থাকার জাতীয়তাবাদ’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে। বর্তমান নেতারা এই যুদ্ধকে এখন আর কেবল ধর্মের লড়াই হিসেবে নয়, বরং ইরানের অখণ্ডতা রক্ষার লড়াই হিসেবে প্রচার করছেন। আলী লারিজনী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করা। এর মাধ্যমে তারা সাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ ইরানিদেরও জাতীয়তাবাদের আবেগে শামিল করতে চাইছে।

খামেনির মৃত্যুতে ‘ব্যথিত’ এরদোয়ান

সমাজবিজ্ঞানী সালেহ আল-মুতাইরি মনে করেন, “সরকার ঘোষিত ৪০ দিনের শোক পালন করা বিরোধীদের জন্য একটি ‘ফাঁদ’। এই সময়ে রাস্তাঘাটে লাখ লাখ শোকাতুর মানুষের ভিড় থাকবে, যা সরকারের জন্য একটি ‘মানব ঢাল’ হিসেবে কাজ করবে। ফলে স্বল্প মেয়াদে সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন দানা বাঁধার সুযোগ পাবে না।”

‘কৌশলগত ধৈর্য’ (Strategic Patience)-এর সমাপ্তি

এত বছর খামেনি বড় কোনো যুদ্ধ এড়াতে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতি মেনে চলতেন। কিন্তু তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান মনে করেন, সেই যুগের অবসান ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘ইরান ২০২৫ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়েছে যে— সংযমকে দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করা হয়।’

নতুন নীতি হতে পারে ‘স্কর্চড আর্থ’ বা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়ার নীতি। আহমাদিয়ান বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে— যদি আক্রান্ত হয়, তবে ইরান সবকিছু জ্বালিয়ে দেবে।’ এর মানে হলো, রাজনৈতিক সতর্কতার বদলে এখন মাঠ পর্যায়ের সামরিক কমান্ডাররা অনেক বেশি উগ্র ও ধ্বংসাত্মক পাল্টা জবাব দিতে পারেন।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ‘মাথা’ হয়তো বিচ্ছিন্ন করা গেছে, কিন্তু এর ‘দেহ’— যার কাছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে— তা এখনও অটুট। গোয়েন্দা ব্যর্থতায় অপমানিত এবং অস্তিত্বের সংকটে থাকা এই নতুন ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক ও সহিংস হয়ে উঠতে পারে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়