
অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সিলিন্ডারের দাম পুনর্নির্ধারণ এবং ডিলারদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এলপিজি ব্যবহারকারী গ্রাহকরা।
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সব কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই সিলিন্ডারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই এলপিজি সিলিন্ডার নেই। কোথাও কোথাও সীমিত সংখ্যক সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দাম হাঁকানো হচ্ছে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তরিকুল হাসান বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে প্রতারণা শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ২১০০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নির্ধারিত ১৩৭০ টাকার তুলনায় অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সারাদিন কোথাও সিলিন্ডার না পেয়ে রাতে টঙ্গী থেকে ২১০০ টাকায় কিনে এনেছি একটা সিলিন্ডার।’
এর আগে বুধবার রাতে দেশের পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। একই দিন সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে এলপিজির মূল্য পুনর্নির্ধারণের দাবি জানান। পাশাপাশি প্রশাসনের মাধ্যমে ডিলারদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধের কথাও উল্লেখ করা হয়।
সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রয়েছে। আজ বিকেল তিনটায় বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দাবি মেনে নেওয়া হলে বিক্রি শুরু হবে, অন্যথায় কর্মসূচি চলবে।
এদিকে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজধানী ঢাকায় এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট লক্ষ করা যাচ্ছে। খুচরা দোকানগুলোতে সিলিন্ডার না থাকায় গ্রাহকদের দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও পাওয়া গেলেও ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত, যেখানে ডিসেম্বর মাসে সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলার ও অপারেটর কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। যাত্রাবাড়ীর কাজলার এক ব্যবসায়ী বাবলু শেখ বলেন, ১০ দিন আগে যে গ্যাস ১২৫০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন সেটাই ২২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ডিস্ট্রিবিউটররা বলছে, আমদানি কমে গেছে।
যদিও এলপিজি পরিবেশকরা অভিযোগ করেছেন, অপারেটর কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম সিলিন্ডার সরবরাহ করছে এবং সেখানেও বাড়তি দাম নিচ্ছে। এতে ডিলার, খুচরা বিক্রেতা—সব পর্যায়েই দাম বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বৃদ্ধি, আমদানি জাহাজ সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে এলপিজি, চিনি ও ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে এলপিজির বাজারে নৈরাজ্যের জন্য সিন্ডিকেটকে দায়ী করে সরকারের কাছে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারির আহ্বান জানানো হয়েছে।
মগবাজারের বাসিন্দা শামছুন্নাহার মাহমুদা নামের ভুক্তভোগী গৃহিণী বলেন, ‘বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপিজি কখনোই পাওয়া যায় না। আগে ২০০ টাকা বেশি দিলেই পাওয়া যেত, এখন ২ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। তদারকি না থাকলে দাম নির্ধারণের কোনো অর্থ থাকে না।’
সব মিলিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ ও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের রান্না ও দৈনন্দিন জীবন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।