পিলখানার হত্যাকাণ্ড: ১৭ বছর পরও অমীমাংসিত প্রশ্ন

ফানাম নিউজ
  ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:২৩

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর দাগ রাখে—পিলখানা ট্র্যাজেডি। দেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে যাওয়া এই বিদ্রোহ এবং হত্যাযজ্ঞে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিজিবি সদস্য এবং পাঁচ বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক শাকিল আহমেদও তাদের মধ্যে ছিলেন। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ ছিল চরম নির্মম; বিদ্রোহীরা দরবার হলে ঢুকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়, পরিবারকে জিম্মি করে এবং চারপাশে গুলি ছুঁড়তে থাকে। ৩৬ ঘণ্টার এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে পিলখানা পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে এবং পরে সেখান থেকে গণকবরের মাধ্যমে লাশ উদ্ধার করা হয়।

এখনো, ১৭ বছর পরও এই ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অমীমাংসিত। ঘটনার পরপরই গঠিত হয়েছিল জাতীয় ও সেনা তদন্ত কমিটি, কিন্তু তাদের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন হয়নি। স্বাধীন তদন্ত কমিশনও দীর্ঘ ১১ মাসের অনুসন্ধানের পর প্রতিবেদন দাখিল করলেও, এখনও তা প্রকাশ হয়নি এবং কোনো কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে ৫১ জনকে দায়ী করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা প্রমাণ চেপে রাখার কারণে ন্যায়বিচার স্থগিত রয়েছে।

আইনগত প্রক্রিয়ায়, হত্যাকাণ্ডের জন্য দুটি মামলা হয়েছে। ৮৫০ আসামির মধ্যে বিচারিক আদালত ২০১৩ সালে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০২০ সালে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে ১৩৯ জনের। কিন্তু রায় ঘোষণার ১৭ বছর পরও সর্বোচ্চ শাস্তির কার্যকর প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়নি, এবং জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায়বিচারের অপেক্ষা চলছেই।

রাজনৈতিক দিক থেকেও এই ট্র্যাজেডি প্রভাব বিস্তার করেছে। স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে, তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। জবানবন্দিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম এসেছে। তবে রাজনৈতিক চাপ ও সরকারের পরিবর্তনের ফলে অনেক তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

এ দিকে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে নতুন কোনো তদন্ত কমিশন হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে শহীদ সেনাসদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীন তদন্ত কমিশনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে এবং এই হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার হবে।

সরকারি উদ্যোগে ২০২৫ সাল থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে, যা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে শুধুমাত্র স্মরণ উৎসব যথেষ্ট নয়; ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুনঃতদন্তের জন্য কমিশন গঠন করার কথা ছিল, যা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার কারণে জনগণের আস্থা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

পিলখানা ট্র্যাজেডি শুধুমাত্র একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট, যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং বিচারিক ব্যর্থতা একত্রিত হলে কী পরিমাণ মানবিক ও সামাজিক ক্ষতি হতে পারে। ১৭ বছর পরও এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা ও স্বাধীনতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়