
গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলে উন্নতি হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সংকটের কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোয় দুঃখপ্রকাশ করে তিনি জানান, সামিট টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি খালাস করতে না পারা এবং এক্সিলারেট টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে না পারায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে জানতে চাইলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বর্তমান কী অবস্থায় আছে এই বিষয়টা আপনারা গণমাধ্যমে লিখছেন যে এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের জন্য দিনক্ষণ বলাটা কঠিন।’
সামিট টার্মিনালে এলএনজি কার্গো খালাসে বিলম্বের কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে যে সামিট টার্মিনালে যে কার্গোটা ওয়েট করছে বঙ্গোপসাগরে কিন্তু রাফ থাকবার কারণে সামিট টার্মিনালে সে কার্গোটা কিন্তু রিলিজ হতে পারছে না।’
অন্যদিকে, এক্সিলারেট টার্মিনালও বর্তমানে আংশিক সক্ষমতায় চলছে বলে জানান তিনি। এ টার্মিনালকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে হলে প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জনদুর্ভোগ যাতে কম হয়, সে বিষয়টি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এক্সিলারেট টার্মিনাল বর্তমানে বয়লারজনিত সমস্যার কারণে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। একই সময়ে সামিট টার্মিনালে বঙ্গোপসাগরের বৈরি আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না।
মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই, ভোগান্তি চরমে। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। আমরা বারবার সে কারণে বাংলাদেশের জনগণের কাছে দুঃখপ্রকাশ করছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে তো আমরা অসহায়। আত্মসমর্পণ করতে হয় প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতি স্বাভাবিক হলে ইনশাল্লাহ আমরা এই গ্যাসটা ডিসচার্জ করতে পারবো এবং সেক্ষেত্রে গ্যাস সাপ্লাই স্বাভাবিক হবে ইনশাআল্লাহ।’
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একটা কৌশল নিয়েছি, আমরা সেই কৌশলটা গতকাল সন্ধ্যা থেকে নিয়েছি। আমরা আশা করছি আজ সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলে উন্নতি হবে ইনশাআল্লাহ।’
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার কাছে সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানোর পর দেশটির সঙ্গে তিনি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। পরে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল মালয়েশিয়া গেছে। তাদের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে এবং অন্তত একটি কার্গো এলএনজি পাওয়ার আশা করছে সরকার।
আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, এটি একটি প্রক্রিয়ার বিষয় এবং বাজারে প্রয়োজনীয় আইএসও ট্যাংকের প্রাপ্যতাও একটি বিষয়। এ কারণে এটিকে মধ্যমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের হাতে থাকা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের হাতে যতগুলো বিকল্প ছিল। আমরা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।’
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকেও কোনো পরামর্শ থাকলে তা গ্রহণ করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কতদিন স্থায়ী হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানাতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মেসেজ দেবার মতো জায়গায় যদি আমি থাকতাম অবশ্যই আমি দিতাম। শুধু আমি আপনাকে এইটুকুই বলবো জনদুর্ভোগকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছি। আমার ধারণা জনগণ বোঝেন, আপনারাও বোঝেন। আমাদের চেষ্টার ন্যূনতম কোনো ত্রুটি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি টাইম টু টাইম আমার কাছে তথ্য আসামাত্রই আমি দেবার চেষ্টা করবো।’
দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়।
বর্তমান সংকটের পেছনে অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্তেরও প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানান, আগের সরকারগুলো মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক সমাধানের পথে এগিয়েছে। এর ফলে কোনো এক সময় এ ধরনের সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘একেক যখন মূল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন একটি সময় তার মাশুল দিতে হয়। বিগত সরকারগুলো কোনো মধ্যমেয়াদি কোনো দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান সূত্র খোঁজেননি। তাৎক্ষণিক সমাধানের পথে গেছেন। ভুলে গেছেন হঠাৎ করে একটি সংকট এনেছেন। সে সংকটের সময়টা হয়তো বা আজকে এসেছে। আজকে না হলে তো আগামীকাল আসতো, আগামীকাল না হলে তো পরশুদিন আসতো। একটি সময় এই পরিস্থিতির মুখোমুখি আপনাকে আমাকে হতেই হতো।’
জনরোষের আশঙ্কায় পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জনরোষে আমরা দিইনি। আমরা দিইনি। জনরোষের কারণে আরইবি দিয়েছে, আরইবি, আমরা দেইনি। আপনি আমার কাছে যদি বলেন, আমি এই মন্ত্রণালয়কে রিপ্রেজেন্ট করছি।’