
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিনই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। অর্থাৎ ভোটাররা একই দিনে দুটি সিদ্ধান্ত দেবেন—একটি সরকার গঠনের জন্য, আরেকটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই গণভোটের বিষয়বস্তু এবং এর ফলাফলের বাস্তব প্রভাব এখনো অনেক ভোটারের কাছেই স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে—গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কি জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে? আর ‘না’ জয়ী হলে কী হবে?
জুলাই জাতীয় সনদ এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ থেকে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে সম্মত হয়। এগুলো দুই ভাগে বিভক্ত—সংবিধান সংশোধনসাপেক্ষ ৪৭টি প্রস্তাব এবং আইন, অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য ৩৭টি প্রস্তাব।
কিন্তু গণভোটটি হচ্ছে মূলত সাংবিধানিক গণভোট। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজের ভাষায়, এবারের গণভোটে কেবল সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৩০টি প্রস্তাব জনগণের সামনে তোলা হচ্ছে। এখানেই বিভ্রান্তির সূচনা। কারণ রাজনৈতিক বক্তব্যে “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন” বলা হলেও, বাস্তবে ব্যালটে পুরো সনদের সব প্রস্তাব নেই।
আইনজ্ঞ মনজিল মোরশেদ এই দ্বৈততার দিকটি তুলে ধরে বলেছেন, একদিকে জুলাই সনদের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যালটে রাখা হচ্ছে মাত্র চারটি বিষয়—যার বাইরে থাকা সংস্কারগুলো ভোটাররা সরাসরি অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে ‘হ্যাঁ’ ভোট মানেই পুরো সনদের নিশ্চয়তা—এমন ধারণা তৈরি হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
ব্যালটের চারটি প্রশ্ন
গণভোটের ব্যালটে যে চারটি বিষয়ের ওপর ভোট হবে, তার মধ্যে প্রথম তিনটি সরাসরি সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ ইত্যাদি। চতুর্থ প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে ভিন্ন প্রকৃতির—এতে বলা হয়েছে, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
এই চতুর্থ অংশটি আইনগত বাধ্যবাধকতার চেয়ে বেশি নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জায়গা তৈরি করে। অর্থাৎ এখানে জনগণ কোনো নির্দিষ্ট সংস্কার অনুমোদন করছেন না, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা রাখছেন।
‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কী হবে?
‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলোর পক্ষে জনগণের সরাসরি সম্মতি পাওয়া যাবে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে, এতে জুলাই সনদের সাংবিধানিক অংশ একটি শক্ত ভিত্তি পাবে এবং পরবর্তী সংসদের জন্য তা বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে না। জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও প্রায় একই—তাদের মতে, সংবিধানই হলো মৌলিক সংস্কার; এটি হলে বাকি সংস্কারগুলো স্বাভাবিকভাবেই অর্থবহ হয়ে উঠবে।
এক্ষেত্রে একটি কন্সটিটিউশনাল কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করার পরিকল্পনার কথাও এসেছে। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জুলাই সনদের অন্তত সাংবিধানিক অংশ বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি পূর্ণাঙ্গ জুলাই সনদের নিশ্চয়তা নয়। সংবিধানের বাইরে থাকা সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পরবর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের ওপর।
‘না’ জয়ী হলে কী হবে?
গণভোটে ‘না’ জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারিভাবে খুব বেশি আলোচনা নেই—এটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। রাজনৈতিক তত্ত্বে গণভোটকে অনেক সময় ক্ষমতা পুনর্গঠনের কৌশল হিসেবে দেখা হয়, বিশেষ করে যখন ‘না’ ফলাফলের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকে না।
আলী রীয়াজ স্বীকার করেছেন, ‘না’ জয়ী হলে সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা দুর্বল হয়ে যাবে এবং সেগুলো তখন নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। অর্থাৎ জনগণের সরাসরি সম্মতি না থাকলে, জুলাই সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয় হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোটে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ ‘হ্যাঁ’ ভোট গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ফলে এবার যদি ‘না’ জয়ী হয় এবং সরকার তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই একটি ‘managed legitimacy exercise’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও অনিশ্চয়তা
জামায়াত ও এনসিপি স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেও তাদের অবস্থানে একটি কৌশলগত অস্পষ্টতা দেখা যায়—যেখানে দলীয় সিদ্ধান্ত ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে হলেও আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে নৈতিক অঙ্গীকারের কথা দলের পক্ষ থেকে বেশি বলা হচ্ছে। যদিও বিএনপি প্রধান তারেক রহমান সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ করেছেন। তবুও তৃণমূলে বিএনপির নেতাকর্মীদের অবস্থান ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে কিছু দল ‘না’-এর পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে, যা দেখায় যে এই গণভোটে বাস্তব রাজনৈতিক বিভাজন আছে।
এই গণভোট কেবল একটি নীতিগত প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক আস্থার ওপর একটি বড় পরীক্ষা। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকার জুলাই সনদের সাংবিধানিক অংশ বাস্তবায়নের জন্য শক্ত রাজনৈতিক বৈধতা পাবে, কিন্তু তাতেও পুরো সনদের নিশ্চয়তা মিলবে না। আর ‘না’ জয়ী হলে সেই বৈধতার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে এবং সরকারকে প্রমাণ করতে হবে—গণভোট তাদের কাছে কেবল অনুমোদন আদায়ের হাতিয়ার নয়, বরং জনগণের রায় মেনে নেওয়ার একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
শেষ পর্যন্ত গণভোটের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে ফলাফলের সংখ্যায় নয়, বরং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক চরিত্র এবং যে কোনো ফলাফল রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করার সদিচ্ছার মাধ্যমে। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই।