জিয়া থেকে তারেক: ৪৮ বছরে বিএনপির নেতৃত্বের পালাবদল, সামনে যত চ্যালেঞ্জ

ফানাম নিউজ
  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪২

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে যাত্রা শুরু করা দলটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির নেতৃত্বে এসেছেন জিয়াউর রহমান, তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে তাঁদের ছেলে তারেক রহমান।

দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। এবার দলটির সামনে শুধু সরকার পরিচালনার চ্যালেঞ্জই নয়, সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, জনগণের আস্থা ধরে রাখা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের মতো নতুন পরীক্ষাও রয়েছে।

জিয়াউর রহমানের হাতে বিএনপির জন্ম

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার ধারণাকে সামনে রেখে দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মসূচিতে ছিল ১৯ দফা।

বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের মানুষকে একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন জিয়াউর রহমান। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁর নিহত হওয়ার পর দলটি নেতৃত্বের সংকটে পড়ে। পরে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন তাঁর সহধর্মিণী খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিস্তার

১৯৮২ সালে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর দীর্ঘ সময় দলের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি সরকার গঠন করে। ফলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি একদিকে যেমন দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনারও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পায়।

চার দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বেই জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি একটি বড় গণভিত্তিক ও নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত হয়।

রাজনীতিতে তারেক রহমানের উত্থান

বিএনপির মিডিয়া সেল সূত্রে জানা যায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই মায়ের সঙ্গে রাজপথের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তারেক রহমান। ১৯৮৮ সালে বিএনপির বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন তিনি।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন তারেক রহমান। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে সম্মেলনের আয়োজন করেন তিনি। ওই সম্মেলনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন তারেক রহমান। ২০০২ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটি তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে মনোনীত করে। ২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করে বিভিন্ন উপজেলা ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান তারেক রহমান। ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাঁকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ২০২৬ সালে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারপারসনের পদ শূন্য হলে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তারেক রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসে।

নেতৃত্বের তিন পর্ব

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসকে মোটাদাগে তিনটি নেতৃত্বপর্বে ভাগ করা যায়।

জিয়াউর রহমানের সময়—দলের প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ।

খালেদা জিয়ার সময়—বিএনপিকে গণভিত্তিক ও নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত করা এবং একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া।

তারেক রহমানের সময়—দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি পেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলকে পরিচালনা এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে বিএনপি কতটা নিজেদের সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা কার্যকর হতে পারে।

সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য

ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। বিরোধী দলে থাকার সময়ের রাজনৈতিক কর্মকৌশল সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হয় না।

সরকারের সিদ্ধান্তের দায় যেমন সরকারের ওপর পড়ে, তেমনি দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের প্রভাবও দলের ভাবমূর্তিতে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বিস্তার, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ কিংবা দলীয় পরিচয়ে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই প্রশাসন ও দলীয় সংগঠনকে পৃথক রেখে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা।

তৃণমূলে গ্রুপিং ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব

দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষমতায় আসার পর পদ-পদবি, মনোনয়ন, প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

একই এলাকায় একাধিক নেতা নিজেদের অনুসারী তৈরি করলে সাংগঠনিক বিভক্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন এবং দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে।

তাই তৃণমূল নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গ্রুপিং নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়

বিএনপির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় করা। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের নেতাকর্মীরাও এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকৌশলেও পরিবর্তন আসছে। ফলে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ধরে রেখে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগঠনকে মানিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি

ক্ষমতায় থাকলে দলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ে। কোনো নেতার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড কিংবা অনিয়মের অভিযোগও শেষ পর্যন্ত পুরো দলের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত মানা, সাংগঠনিক কাঠামোর প্রতি আনুগত্য এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা দেখানো বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় জবাবদিহি দুর্বল হলে শুধু সাংগঠনিক শৃঙ্খলাই নয়, সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও জনসম্পৃক্ততা

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর মতে, বর্তমান সময়ে দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশকে নতুন করে পুনর্গঠন করা।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক শূন্যতার সময়ে জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি জিয়াউর রহমানের চিন্তা ও আদর্শ।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ সময়ে দেশের অর্থনীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেও দুর্বল করা হয়েছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন, কার্যকর ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।

তাঁর মতে, অর্থনীতি পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও কাজ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে অপসংস্কৃতি ও মৌলবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে সচেতন করে একটি সুস্থ, মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ধরে রাখাও বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলে থাকার সময় যে জনসম্পৃক্ততা দলটির রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেটি ধরে রাখা সহজ হবে না।

দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা হলে তার প্রভাব সরকারের পাশাপাশি দলের জনপ্রিয়তার ওপরও পড়তে পারে।

সামনে নতুন পরীক্ষা

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীত স্মরণের উপলক্ষ্য নয়। জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এখন তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে তারেক রহমানের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে বিএনপির সামনে মূল পরীক্ষা হবে—সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য রাখা, তৃণমূলের দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়, দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করে জনগণের আস্থা ধরে রাখা।

৪৮ বছরের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা পেরিয়ে বিএনপি এখন যে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, সেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন হবে—দলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে কীভাবে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব সরকার পরিচালনা করা যায়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়