রাজপথ থেকে ক্ষমতায়, জনপ্রিয়তা ধরে রাখাই কি বিএনপির বড় পরীক্ষা?

ফানাম নিউজ
  ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৪

দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক তৎপরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপি এখন নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। বিরোধী দল থেকে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে জনসমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়াই দলটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলে থেকে সরকারের সমালোচনা করা এবং ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের দায় নেওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই বিএনপিকে এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব কাজ ও দৃশ্যমান সাফল্যের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, তৃণমূলকে শক্তিশালী করা এবং দলের সর্বস্তরে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা বিএনপির অন্যতম অগ্রাধিকার। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণের বিষয়গুলোও সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, দলীয় পদে ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর পুনর্গঠন তৃণমূলের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকে নজর রয়েছে দলের হাইকমান্ডের।

তবে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তৃণমূলের প্রত্যাশার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সমন্বয় না থাকলে তা দলটির জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল ও অঙ্গসংগঠনের একশ্রেণির নেতাকর্মীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো হাইকমান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে বর্তমানে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাদের নিজেদের নেতাকর্মীরা। তৃণমূলের একশ্রেণির নেতাকর্মী এখনো বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত। পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও দলটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অনেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দলের ভেতর থেকেই গুরুতর অভিযোগ উঠছে।

তিনি আরও বলেন, সংসদে নেওয়া কিছু আইন ও সিদ্ধান্ত গণভোটের রায়, সংবিধান কিংবা আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের কিছু পদক্ষেপও সংবিধান, বিদ্যমান আইন এবং বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে দলটির সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু অবশ্য সরকারের সামনে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশকে আবার গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে আনাই বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব। দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুপস্থিত থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবর্তী সরকারের সময়ে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা থেকে দেশকে বের করে আনার পাশাপাশি বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং বেকারত্ব দূর করার অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসাটাই স্বাভাবিক। সরকারের মূল কাজ হলো সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়ন সুসংহত করা। বিএনপি সরকার সেই লক্ষ্যেই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

বিএনপির সামনে এখন তাই একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা, অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখার পরীক্ষা। দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত জনসমর্থনকে টেকসই রাজনৈতিক আস্থায় রূপান্তর করতে পারাই দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়