পথে পথে সংঘর্ষ, শেরপুরে যেভাবে প্রাণ গেল জামায়াত নেতার

ফানাম নিউজ
  ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২২
আপডেট  : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪০

শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সামনের সারির চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় ধারাবাহিক সংঘর্ষে। প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় সাংবাদিক এবং ভিডিও ফুটেজের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টার টানাপোড়েন, পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেই ঘটে এই প্রাণঘাতী ঘটনা।

যেভাবে শুরু

বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে ঝিনাইগাতী স্টেডিয়ামে শেরপুর-৩ আসনের সব প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিলেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। শেরপুর-৩ আসনে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী—এই দুই উপজেলা অন্তর্ভুক্ত।

অনুষ্ঠান শুরুর আগে জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের কর্মী-সমর্থকেরা এসে স্টেডিয়ামের সামনের সারির বেশির ভাগ চেয়ারে বসে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনুষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক চেয়ার রাখা হয়েছিল।

এদিকে বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল শ্রীবরদী উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকায় অনুষ্ঠানে আসতে দেরি করেন। তাঁর সমর্থকেরাও দেরিতে অনুষ্ঠানে পৌঁছান। এসে তাঁরা দেখেন, সামনের সারির বেশির ভাগ চেয়ার ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে।

চেয়ারের বিরোধ থেকে উত্তেজনা

এ সময় বিএনপির নেতারা ইউএনওকে সামনে থাকা আসন অর্ধেক করে ভাগ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। ইউএনও জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলকে কিছু চেয়ার ছেড়ে দিতে বলেন। এরপর বাদল মাইকে তাঁর কর্মীদের আসন ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, মাইকে বলার পর জামায়াতের সমর্থকেরা পেছনের অর্ধেক সারির চেয়ার ছেড়ে দেন। তবে সামনের সারির চেয়ারও খালি করার জন্যও বিএনপির নেতাকর্মীরা চাপাচাপি করতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, জামায়াতের সমর্থকেরা সভাস্থলে আগে আসলেও তাদের সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আর বিএনপির নেতাকর্মীরা পরে আসলেও সবাই চেয়ারে বসবেন। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি স্লোগান শুরু হয়। একপর্যায়ে সামনের সারিতে বসা চেয়ার থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীদের তুলে দেওয়ার চেষ্টা হলে হাতাহাতি শুরু হয়। এরপর চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও মারামারি ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

স্টেডিয়াম ছাড়লেও থামেনি সংঘাত

সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্টেডিয়াম এলাকা ছেড়ে দক্ষিণ দিকে ঝিনাইগাতী বাজার এলাকায় অবস্থান নেন। স্টেডিয়ামে তখন জামায়াত প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকেরা অবস্থান করছিলেন।

এর কিছু সময় পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফাহমী গোলন্দাজ সোহেল’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে জামায়াত প্রার্থীকে নিয়ে হুমকিমূলক একটি স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করে।

রাস্তা নিয়ে জটিলতা

ঝিনাইগাতী বাজার দিয়ে গেলে শ্রীবরদী উপজেলায় ফেরার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে শ্রীবরদীর নেতাকর্মীরাও ছিলেন। বিকল্প হিসেবে গ্রাম ঘুরে যাওয়ার পথ থাকলেও নুরুজ্জামান বাদল সেটি মেনে নিতে রাজি হননি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাজার এড়িয়ে গেলে রাজনৈতিকভাবে ‘ভয়ে পিছু হটা’র বার্তা যাবে—এই আশঙ্কা থেকেই তিনি মূল সড়ক দিয়েই যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। ইউএনও ও কয়েকজন বিএনপি নেতা তাঁকে উত্তর দিক দিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রার্থীকে নিরাপত্তা দিয়ে রাস্তা পার করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি কর্মী-সমর্থকদের নিরাপত্তাসহ যাওয়ার দাবি জানান। এ নিয়ে বেলা সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা অচলাবস্থা চলে।

অন্যদিকে বাজার এলাকায় অবস্থান নেওয়া বিএনপির নেতাকর্মীরাও জানিয়ে দেন, তাঁরা জামায়াত প্রার্থীকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে দেবেন না। পুলিশ ও প্রশাসনের অনুরোধেও তাঁরা সরে যাননি।

দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষ

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে স্টেডিয়ামে অবস্থানরত জামায়াতের প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে ঝিনাইগাতী বাজারের দিকে এগিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাজারের কাছাকাছি পৌঁছালে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রথম দফায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের হামলায় বিএনপির সমর্থকেরা কিছুটা পিছু হটেন। একজন বিএনপি সমর্থক আঘাত পেয়ে রাস্তায় পড়ে যান। তবে তাঁরা পুরোপুরি রাস্তা ছাড়েননি।

এই সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশ দুপক্ষ মাঝখানে অবস্থান নেয়।

প্রাণঘাতী মুহূর্ত

পালিয়ে যাওয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রায় ১৫ মিনিট পর লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পাল্টা ধাওয়া শুরু করেন। এতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে ও স্টেডিয়ামের দিকে সরে যান।

এই সময় শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম পেছনে পড়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও অনুযায়ী, তাঁকে একা পেয়ে কয়েকজন হামলাকারী দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মাথা ও কানের নিচে আঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত হাফেজ রেজাউলের ভাই কেএম আহসানের ওপরও হামলা চালানো হয়।

নিহতের ভাইয়ের বর্ণনা

নিহত রেজাউল করিমের ভাই কেএম আহসান বলেন, আমি আর আমার ভাই পাশাপাশি ছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে এসে বিএনপির নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করলে ভাই রাস্তায় পড়ে যায়। আমি এগোতে গেলে চার-পাঁচজন আমার ওপর হামলা করে। মাথায় আঘাত পেয়ে কোনোরকমে সরে যাই। পরে ফিরে এসে দেখি, ভাই পড়ে থাকা অবস্থায় ৮–১০ জন তাকে মারছে। পাশেই সেনাবাহিনী ছিল, কিন্তু কোনো সহায়তা পাইনি।

তিনি আরও বলেন, পরে স্থানীয় লোকজন এসে তাঁর ভাইকে সরিয়ে নেয়। নিজেও গুরুতর আহত অবস্থায় আশ্রয় নেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

পুরো ঘটনাপ্রবাহে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সাংবাদিকেরা। তাঁদের মতে, প্রথম দফার সংঘর্ষেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতো দূর গড়াতো না। বাজারের রাস্তা অবরোধ বা প্রার্থীকে বিকল্প পথে যেতে বাধ্য করার উদ্যোগ নিলেও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।

এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর একজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেরপুরের এই ঘটনা জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়